মৃত্তিকা সৃষ্টিতে জলবায়ু ও আদি শিলা ভূমিকা সংক্ষেপে লেখ।

মৃত্তিকা সৃষ্টিতে জলবায়ু ও আদি শিলার ভূমিকা এই লেখাটিতে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল। দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এটি 2019 সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় এসেছিল। 2023 এর পরীক্ষার্থীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি এগুলি তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করবে। তোমরা নিজেরা মনোযোগ সহকারে পড়ো এবং প্রশ্নগুলো তোমাদের বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করো।

মৃত্তিকা সৃষ্টিতে জলবায়ুর ভূমিকা:

      মৃত্তিকা সৃষ্টিতে জলবায়ুর ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ুর বিভিন্নতায় মাটির ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও ভিন্ন প্রকৃতির হয়ে থাকে। জলবায়ুর বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে –

  • বৃষ্টিপাত
  • উষ্ণতা

মৃত্তিকা গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্ৰহণ করে। এছাড়া – 

  • আর্দ্রতা
  • বায়ুপ্রবাহ

গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

1. বৃষ্টিপাত:

                 জলবায়ুর অন্যতম উপাদান হল বৃষ্টিপাত। বৃষ্টিপাতের পরিমাণগত পার্থক্য ও তীব্রতা মৃত্তিকা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বহন করে –

  1. বেশি বৃষ্টিপাত যুক্ত আর্দ্র অঞ্চলে রাসায়নিক ও যান্ত্রিক আবহবিকার বেশি হওয়ায় মৃত্তিকায় কর্দম কণার প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।
  2. যে সমস্ত অঞ্চলে জলবায়ু আর্দ্র ও নাতিশীতোষ্ণ প্রকৃতির সেখানে বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ার জন্য মাটির ধৌত প্রক্রিয়া খুব বেশি হয়। ফলে মাটির উপরিস্তর থেকে সহজে দ্রবণীয় খনিজ পদর্থগুলি অপসারিত হয় এবং মৃত্তিকার প্রকৃতি অম্লধর্মী হয়।
  3. মরুপ্রায় অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় রাসায়নিক আবহবিকার কম হয় আবার ধৌত প্রক্রিয়াও বেশি হয় না। ফলে ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম এর মতো দ্রবণীয় খনিজ পদার্থগুলি মৃত্তিকার উপরিস্তর থেকে অপসারিত হয় না।
  4. অধিক বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চলে মৃত্তিকার স্তরগুলি পুরু হওয়ায় মৃত্তিকার গভীরতা বৃদ্ধি পায়।
  5. বৃষ্টিপাত ও অনুপাতের উপর নির্ভর করে যেখানে ক্যালসিয়াম বাই কার্বনেট ধৌত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে A স্তর থেকে অপসারিত  হয়ে  B স্তরে সঞ্চিত হয়, সেখানে পেডোক্যাল মৃত্তিকার সৃষ্টি হয়।
  6. বৃষ্টিপাত বেশি হলে মৃত্তিকার আর্দ্রতা বেশি হয়, যার ফলে মাটিতে ঘন উদ্ভিদের আবরণ লক্ষ্য করা যায়, যা মাটির নাইট্রোজেনের পরিমাণকে বৃদ্ধি করে এবং মাটি উর্বর হয়।

2. উষ্ণতা:

              উষ্ণতা বিভিন্নভাবে মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে –

  1. বিজ্ঞানী ভন হফট এর মতে প্রতি 10° সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে রাসায়নিক বিক্রিয়ার হার দ্বিগুণ হয়। তাই উষ্ণমণ্ডলে মৃত্তিকা ক্ষয় বেশি হয়।
  2. উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে আবহবিকার বেশি কার্যকর হয়, ফলে রেগোলিথ এর স্তর পুরু হয় ও মৃত্তিকার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
  3. অধিক উষ্ণ অঞ্চলে মৃত্তিকায় কাঁচা জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যায় এবং মৃত্তিকায় নাইট্রোজেনের পরিমাণ কমে যায়।
  4. বেশি উষ্ণতায় মৃত্তিকায় কেওলিন( কাঁদা জাতীয় খনিজ) এর পরিমাণ বাড়তে থাকে।
  5. আর্দ ক্রান্তীয় অঞ্চলে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে সিলিকা এবং সেসক্যুই অক্সাইড এর অনুপাত কমে যায়।
  6. বৃষ্টিপাত ও উষ্ণতার তারতম্যের জন্য বিভিন্ন জলবায়ুতে বিভিন্ন প্রকার আঞ্চলিক মৃত্তিকার প্রাধান্য দেখা যায়।যেমন- উষ্ণ-আর্দ্র জলবায়ুতে অম্লধর্মী ল্যাটেরাইট মাটি, নাতিশীতোষ্ণ আর্দ্র জলবায়ুতে পডজল মৃত্তিকা, উষ্ণ-আর্দ্র নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুতে চারনোজেম এবং মরু ও মরুপ্রায় অঞ্চলে মাটি শুষ্ক ও ক্ষারধর্মী লবণাক্ত প্রকৃতির হয়।

3. আর্দ্রতা:

                জলবায়ুর উপাদানগুলির মধ্যে অন্যতম হল আর্দ্রতা। জলের সাহায্যে দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয় পদার্থের স্থানান্তর মাটির স্তর সৃষ্টিতে সাহায্য করে –

  1. নিরক্ষীয় অঞ্চলে আর্দ্রতা বেশি বলে, সেখানে মৃত্তিকার স্তর পুরু। কিন্তু উষ্ণ মরু অঞ্চলে আর্দ্রতার পরিমাণ কম বলে মৃত্তিকার স্তরবিন্যাস সীমাবদ্ধ।
  2. আর্দ্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিলার আবহবিকারের পরিমাণ বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে আবহবিকার যথেষ্ট গভীরে পৌঁছায়। তাই উষ্ণ-আর্দ্র নিরক্ষীয় অঞ্চলে মাটির গভীরতা বেশি
  3. মৃত্তিকায় বিভিন্ন প্রকার কাঁদা কলয়েডের উৎপত্তি আর্দ্রতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
  4. আর্দ্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এলুভিয়েশন প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে pH এর মান ও ক্ষারক সম্পৃক্তি কমে যায়।
  5. আর্দ্রতা কমলে ব্যাকটেরিয়া, অ্যালগি ও বিশেষ করে ফাঙ্গির সংখ্যা ও সক্রিয়তা কমে যায়।
  6. মাটির মধ্যে আর্দ্রতার চলাচলের মাধ্যমে, মাটির স্তরের অন্তর্গত বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগ ও শিলাচূর্ণের ওঠানামা ঘটে বলে, একে মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা পদার্থ ও বস্তুকণার চলাচলের মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

4. বায়ুপ্রবাহ:

           অনেক সময় মাটি অপসারণের ক্ষেত্রে বায়ুপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্ৰহন করে। মরু অঞ্চলে তীব্র বায়ুপ্রবাহের দ্বারা বালুকণা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়, এবং সেখানে মৃত্তিকা গঠনে সাহায্য করে। একইভাবে উপকূলবর্তী অঞ্চলে এই ঘটনা ঘটতে লক্ষ্য করা যায়। যেমন – চীনের হোয়াং হো নদী উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বায়ুপ্রবাহের দ্বারা সেখানে লোয়েস মাটি গঠিত হয়েছে।

মৃত্তিকা সৃষ্টিতে আদি শিলার ভূমিকা:

যে শিলা থেকে সাধারণ মাটির সৃষ্টি হয় তাকে আদি শিলা বা জনক শিলা বলে। আবহবিকার, ক্ষয় ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে আদি শিলা মৃত্তিকাতে পরিবর্তিত হয়। আদি শিলার ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং অবস্থানের তারতম্যে মৃত্তিকা সৃষ্টির মধ্যেও তার গুণাগুণের পার্থক্য লক্ষ করা যায়। যেমন –

  • গ্ৰানাইট শিলা থেকে সৃষ্ট মৃত্তিকা সাধারণত বেলে মৃত্তিকা হয়।
  • ব্যাসল্ট শিলা থেকে সৃষ্ট মৃত্তিকার প্রকৃতি অনেকটা ক্ষারকীয় এবং কৃষ্ণবর্ণ যুক্ত হয়।
  • সিস্ট শিলা থেকে সৃষ্ট মৃত্তিকাতে কাঁদাকণার পরিমাণ বেশি। অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামের পরিমাণ বেশি।
  • আদি শিলায় বেশি পরিমাণে সিলিকা থাকলে মৃত্তিকা পডসল প্রকৃতির হয়।
  • কোয়ার্টজাইট শিলার চূর্ণ ল্যাটেরাইট জাতীয় লোহিত বর্ণের মাটির সৃষ্টি করে। যার মধ্যে ফেরাস অক্সাইডের পরিমাণ বেশি থাকে।
  • চুনাপাথর ও মার্বেল থেকে রেন্টজিনা মৃত্তিকার সৃষ্টি হয়।

This post was updated on 2023-02-22 17:58:08.

Leave a Comment

error: Content is protected !!