মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়া বলতে কী বোঝো? মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়াগুলি সম্পর্কে লেখ।

মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়া বলতে কী বোঝো এবং মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়াগুলি সম্পর্কে এই লেখাটিতে আলোচনা করা হল। দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি সম্পূর্ণ ভাবে বড়ো প্রশ্ন হিসেবে আসতে পারে আবার কখনো কখনো ছোট ছোট প্রশ্ন হিসেবেও আসতে পারে। অর্থাৎ পার্ট পার্ট করে। আশা করি এগুলি তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করবে। তোমরা নিজেরা মনোযোগ সহকারে পড়ো এবং প্রশ্নগুলো তোমাদের বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করো।

মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়া বলতে কী বোঝো

ভূমিকা:

     আবহবিকারের মাধ্যমে শিলা ও শিলাস্থিত পদার্থগুলি চূর্ণ-বিচূর্ণ ও বিয়োজিত হয়ে নীচের আদি শিলার উপর শিথীল স্তরের সৃষ্টি করে। এই সমজাতীয় পদার্থগুলি কতগুলি কঠিন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে মৃত্তিকা সৃষ্টি করে একে মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়া বলে।

মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়া:

মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়াগুলিকে প্রধানত তিনভাগে ভাগ করা যায়। যথা –

A. প্রাথমিক প্রক্রিয়া:

            আবহবিকারের দ্বারা ভূত্বকের উপরিভাগে কঠিন শিলাচূর্ণকে রেগোলিথ বলে। এই শিলাচূর্ণগুলি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে মৃত্তিকায় পরিণত হয়। মৃত্তিকা বিজ্ঞানী সাইমনসন (1959 খ্রীঃ) মৃত্তিকা সৃষ্টির এই প্রক্রিয়াগুলিকে মৃত্তিকা গঠনকারী প্রাথমিক প্রক্রিয়া বলেন। এই প্রক্রিয়াগুলিকে প্রধানত 4টি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা –

1. সংযোজন:

        মাটি গঠনের বিভিন্ন প্রক্রিয়াগুলির মধ্যে সংযোজন একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এই পদ্ধতিতে মাটিতে জল, জৈব পদার্থ ও বিভিন্ন প্রকার খনিজ পদার্থ সংযোজিত হয়। 

2. অপসারণ:

          মাটি গঠনের অপর এক উল্লেখযোগ্য প্রক্রিয়া হল মাটিতে অবস্থিত পদার্থ সমূহের অপসারণ। বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানগুলির দ্বারা ভূপৃষ্ঠ ক্ষয়ের ফলে মাটির উপরিস্তর থেকে পললের অপসারণ হয়। এছাড়া, মাটির মধ্যে থাকা জৈব পদার্থ জারিত হলে জল ও কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়।

3. রূপান্তর:

এই পদ্ধতিতে মাটিতে অবস্থিত প্রাথমিক খনিজ পদার্থ গুলি বিয়োজিত হয়ে গৌণ খনিজের রূপান্তরিত হয়। এই পদ্ধতির অনেক উপবিভাগ আছে। তবে, এদের বিশেষ উল্লেখযোগ্য উপবিভাগ হল –

  • হিউমিফিকেশন
  • খনিজকরণ

4. স্থানান্তর:

মাটি গঠনে সর্বশেষ প্রক্রিয়াটি হল স্থানান্তর। এই পদ্ধতিতে মাটির উপাদানগুলি একস্তর থেকে অন্যস্তরে স্থানান্তরিত হয়ে জমা হয়। এই প্রক্রিয়াটি দুটি পর্যায়ে বিভক্ত। যথা –

  • এলুভিয়েশন
  • ইলুভিয়েশন

B. মৌলিক প্রক্রিয়া:

            মৃত্তিকা সৃষ্টিতে যে সমস্ত প্রক্রিয়াগুলি প্রত্যক্ষ বা সক্রিয় ভাবে কাজ করে তাকে মৌলিক প্রক্রিয়া বলে। এই প্রক্রিয়াগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল –

1. হিউমিফিকেশন:

              যে পচনমূলক প্রক্রিয়ায় জৈব পদার্থ সমূহ (মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ) বিশ্লিষ্ট ও পুনঃবিন্যস্ত হয়ে যে গাঢ় কালো ও বাদামি বর্ণের চটচটে পদার্থে পরিণত হয় তাকে হিউমাস বলে। এই হিউমাস সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে হিউমিফিকেশন বলে। 

  হিউমিফাকেশন চারটি উপপ্রক্রিয়ায় বিভাক্ত। যথা – 

  • অবায়ুজীবী হিউমিফিকেশন
  • অম্ল হিউমিফিকেশন 
  • মরুপ্রায় অঞ্চলের হিউমিফিকেশন
  • উষ্ণ ও আর্দ্র ক্রান্তীয় অঞ্চলের হিউমিফিকেশন

2. খনিজকরণ:

             মাটি গঠন প্রক্রিয়ায় সাধারণ পদ্ধতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল খনিজকরণ। এই প্রক্রিয়াটি হিউমি-ফিকেশনের বিপরীত প্রক্রিয়া। হিউমিফিকেশনের ফলে সৃষ্ট হিউমাস বায়ুর অক্সিজেন দ্বারা জারিত হয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড, জল ও হিউমাস গঠনকারী খনিজ পদার্থে পরিণত হয়। কিন্তু হিউমাস খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হিউমাস গঠনকারী খনিজগুলি এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনরায় মাটিতে ফিরে আসে।

3. এলুভিয়েশন:

           যে প্রক্রিয়ায় মৃত্তিকার উপরিস্তরের খনিজ পদার্থ সমূহ জলে দ্রবীভূত বা ভাসমান অবস্থায় ধৌত প্রক্রিয়ায় উপরের স্তর থেকে নীচের স্তরে অপসারিত হয়, তাকে এলুভিয়েশন বলে। যে স্তর থেকে খনিজ পদার্থের অপসারণ হয় তাকে এলুভিয়াল স্তর বলা হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলে মৃত্তিকার উপরিস্তরের খনিজ পদার্থ নীচে স্থানান্তরিত হয় বলে উপরিস্তরের রং হালকা হয়।

4. ইলুভিয়েশন:

           মাটি গঠনের মৌলিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ইলুভিয়েশন এক উল্লেখযোগ্য প্রক্রিয়া। যে পদ্ধতিতে মৃত্তিকার ঊর্ধ্বস্তর থেকে যান্ত্রিক বা রাসায়নিক পদ্ধতিতে দ্রবীভূত খনিজগুলি মৃত্তিকার নিম্নস্তরে সঞ্চিত হয়, তাকে ইলুভিয়েশন বলে। সঞ্চিত পদার্থসমূহের স্তরকে ইলুভিয়াল স্তর বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় B স্তরে খনিজ সমৃদ্ধ হয়, তাই এই স্তরের রং গাঢ় প্রকৃতির হয়।

C. বিশেষ প্রক্রিয়া:

               মাটি গঠনে মৌলিক প্রক্রিয়াগুলি সব স্থানে কার্যকরী হলেও বিশেষ প্রক্রিয়া পৃথিবীর সর্বত্র সমান ভাবে কার্যকরী হয় না। এক এক ধরনের প্রক্রিয়া এক এক স্থানে সংঘটিত হয়। মূলত জলবায়ু এবং স্বাভাবিক উদ্ভিদের অবস্থানের ভিত্তিতে এই প্রক্রিয়া কার্যকরী হয়। নীচে প্রক্রিয়াগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হল –

1. ল্যাটেরাইজেশন:

                       ল্যাটেরাইট শব্দটির ল্যাটিন শব্দ ‘ল্যাটার’ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। যার অর্থ ‘brick’ বা ‘ইট’। আর্দ্র ও গ্ৰীষ্ণ মন্ডলীয় জলবায়ুতে অধিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের আধিক্যের ফলে মাটির উপরিউক্ত দ্রবণীয় মাধ্যমে বিয়োজিত জৈব উপাদান, যেমন – ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম প্রভৃতি ক্ষারকীয় পদার্থ এবং সিলিকা অপসৃত হয় এবং B স্তরে অবশিষ্ট লৌহ অক্সাইড ও অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড সঞ্চিত হয়। এই মৃত্তিকা গঠন প্রক্রিয়াকে ল্যাটেরাইজেশন বলে এবং উৎপন্ন মৃত্তিকাকে ল্যাটেরাইট বলে।

       এই ল্যাটেরাইট মৃত্তিকার রং লাল হয়। B স্তরে লৌহ ও অ্যালুমিনিয়াম স্তর সঞ্চিত হয়ে কালক্রমে একটি শক্ত আবরণী স্তর গড়ে তোলে, একে ড্যুরিক্রাস্ট বলে।

2. পডসলাইজেশন:

                    আর্দ্র শীতল জলবায়ু অঞ্চলে তাপমাত্রা কম থাকায় বাষ্পীভবনের পরিমাণ কম হওয়ায় মৃত্তিকা সারাবছর আর্দ্র থাকে। এই অবস্থায় ধৌতকরণ প্রক্রিয়ায় সহজে দ্রবণীয় সোডিয়াম, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম প্রভৃতি ধাতব ক্যাটায়নগুলি মাটির নিম্ন স্তরে সঞ্চালিত হয়। সরলবর্গীয় বৃক্ষের উদ্ভিদ অংশগুলি বিয়োজিত হয়ে জৈব অ্যাসিড উৎপন্ন করে। যা সেসক্যুই-অক্সাইড ও কর্দম কণার সঙ্গে বিক্রিয়া করে জৈব সেসক্যুই ও কর্দম জটিল পদার্থ সৃষ্টি করে এবং মাটিরB স্তরে সঞ্চিত হয়। এই প্রক্রিয়াকে পডসলাইজেশন বলে।

    B স্তরে জৈব সেসক্যুইঅক্সাইড ও কর্দম কণা সঞ্চিত হয়ে একটি শক্ত স্তর গড়ে তোলে, একে হার্ডপ্যান বলে। যেমন – পডসল মৃত্তিকা।

3. গ্লেইজেশন:

              যে পরিবেশে জল নিকাশি ব্যবস্থা যথেষ্ট সুবিধা জনক নয় (অক্সিজেনের অভাব) সে ক্ষেত্রে মৃত্তিকা প্রোফাইলের নিম্নাংশে মূল উপকরণ স্তরের ঊর্ধ্ব এ একটি গ্লে স্তর গঠন হয়। এই গ্লে স্তর গঠন প্রক্রিয়াকে গ্লেইজেশন বলে। গ্লে স্তর হলুদ বা বাদামী রঙের ছোট যুক্ত হয়। যেমন – গ্লে মৃত্তিকা।

4. ক্যালসিফিকেশন:

                 যে প্রক্রিয়ায় মৃত্তিকা প্রোফাইলের অধঃস্তরে ক্যালশিয়াম কার্বনেট সঞ্চিত হয়ে একটি চুন সমৃদ্ধ স্তর গঠন করে সেই প্রক্রিয়াকে ক্যালসিফিকেশন বলে। আবহবিকারের ফলে আদি শিলা থেকে আয়রন রূপে নিঃসৃত ক্যালসিয়াম বাই কার্বনেট কার্বন ডাই অক্সাইডের এর সাথে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম কার্বনেট গঠন করে। অল্প বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চলে কার্বনেট গঠিত তৃণভূমি গুলিতে এই মৃত্তিকা গঠন প্রক্রিয়া কার্যকর হয়। যেমন – চার্নোজেম মৃত্তিকা।

5. স্যালিনাইজেশন:

          যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্তিকার বিভিন্ন লবণ যেমন – সোডিয়াম, সালফেট, ক্লোরাইড প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে মৃত্তিকার মধ্যে একটি লবণ স্তর গঠন করে সেই প্রক্রিয়াকে স্যালিনাইজেশন বলে। যেমন – মরু অঞ্চলের লবণাক্তন মৃত্তিকা।

6. অ্যালকালাইজেশন:

             যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্তিকায় বিভিন্ন সোডিয়াম আয়ন সঞ্চিত হয় বা তার আধিক্য ঘটে তাকে অ্যালকালাইজেশন বলে এই প্রক্রিয়ায় গঠিত মৃত্তিকাকে ক্ষারকীয় মৃত্তিকা বা সোলোনেজ মৃত্তিকা বলে।

This post was updated on 2023-02-22 17:57:32.

Leave a Comment

error: Content is protected !!